জমি বেদখল হওয়ার আশঙ্কা হলে কোন মামলা?

জমি বেদখল হওয়ার আশঙ্কা হলে কোন মামলা?

দেওয়ানি আদালতের অধিকাংশ মামলাই জমিজমা সংক্রান্ত। সমাজে অধিকাংশ বিরোধ জমিজমা কিংবা সম্পত্তি কেন্দ্রিক। আপনার জমিতে অন্য কেউ মালিকানা দাবি করলে তখন আপনি কখন কোন মামলা করবেন, সেটিই আজকের আলোচ্য বিষয়।

উচ্ছেদের মামলা

আমরা যে জমির মালিক সেই জমি আমরা দখলে রাখার অধিকারী। এ জমি অন্য কেউ দখলে নিতে পারবে না। যদি কারো দখলে থাকে তবে আদালতে মামলা করে দখল পুনরুদ্ধার করা যায়। কাউকে আইনানুগভাবে কোনো জমিতে নির্দিষ্ট সময়ের দখল দিলে সেই নির্দিষ্ট সময় পরে দখল বুঝিয়ে না দিলে বেআইনিভাবে শক্তি প্রয়োগ করে দখল উদ্ধার করা যায় না। এ ক্ষেত্রেও মামলা করে দখল উদ্ধার করতে হয়। এ মামলাকে ‘উচ্ছেদের মামলা’ বলে। ১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারায় জজ কোর্টে এ মামলা করা যায়।

সহকারী জজ না সাব-জজ আদালতে মামলা হবে তা নির্ভর করবে জমির দামের ওপর। জমির দাম দুই লাখ টাকা পর্যন্ত হলে সহকারী জজ আদালতে মামলা করতে হবে। দুই লাখ টাকার বেশি কিন্তু চার লাখ টাকার কম দাম হলে সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে। এর চেয়ে বেশি দামের জমির ক্ষেত্রে যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা করতে হয়। সরকার জাতীয় সংসদের মাধ্যমে দেওয়ানি আইন সংশোধন করে জজ সাহেবদের এ ক্ষমতা কম-বেশি করতে পারে। সাধারণত লোকে কোর্ট ফি ফাঁকি দেয়ার জন্য জমির দাম কম দেখায়। তাই অনেক সময় মনে হতে পারে ক্ষমতার চেয়ে বেশি দামের জমির মামলা জজ সাহেব বিচার করছেন কেন? আসলে যিনি মামলা করবেন তিনি আর্জিতে জমির দাম উল্লেখ করবেন। জমির দামের ওপর ভিত্তি করে কোর্ট ফি হিসেবে ‘কোর্ট ফি স্ট্যাম্প’ জমা দিতে হয়।

এ ধরনের মামলায় দখলের জন্যও আবেদন করতে হয়। দখল পুনরুদ্ধারের মামলা করা হলেও এ মামলায় স্বত্বের প্রমাণ করতে হয়। যিনি দখলে থাকেন তাকেই প্রাথমিকভাবে মালিক বলে অনুমান করা হয়। যদি কেউ বিপরীত কিছু বলতে চায় তবে তাকে তা প্রমাণ করতে হয়। এ কারণে দখল পুনরুদ্ধারের মামলায় বাদীকে প্রথমত স্বত্ব প্রমাণ করতে হয়। প্রথমে শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা করার পর আলাদাভাবে দখল দেয়ার জন্য মামলা করা যায় না। একই কারণে বারবার মামলা করলে মানুষ হয়রানি হবে, মামলার সংখ্যা বাড়বে তাই আইনের এ নীতি। আলাদাভাবে মামলা করলে অযথা মামলার সংখ্যা বাড়ে ও সময় নষ্ট হয়। এ আইনের মামলায় স্বত্বের প্রমাণ করতে হয়। বেদখলের ১২ বছরের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হয়। ১২ বছর অতিক্রান্ত হলে তামাদির কারণে আর মামলা করা যায় না। ১২ বছরের মধ্যে বেদখল করার প্রমাণ করতে হয়। স্বত্বহীন ব্যক্তি ১২ বছরের বেশি সময়ের জন্য কোনো জমি দখলে রাখলে মালিকানার দাবি করতে পারেন। সরকারি জমির জন্য এ সময় ৬০ বছর। এ জন্য মামলা করে মালিকানা পেতে হয়। এ মামলাকে ‘বিরুদ্ধ দখলের মামলা’ বলে।

কেউ জোর করে বেদখল করলে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে ১৪৪ ফৌজদারি কার্যবিধির ধারায় মামলা করে জমির দখল ফেরত পাওয়া যায়। এ জন্য বেদখল হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে মামলা করতে হয়। ৬০ দিন পর মামলা করলে পুনর্দখল নেয়া যায় না। ১৪৪ ধারায় মামলা করলে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত একই আইনের ১৪৫ ধারায় জমি ক্রোক করতে পারে। ফৌজদারি আদালতে মামলা করলেও দেওয়ানি আদালতের দরজা খোলা থাকে। দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে কোনো বাধা নেই। মারধর বা শান্তি বিনষ্টের আশঙ্কা থাকলে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে এ মামলা করে রাখা ভালো। এ মামলা করা সত্ত্বেও দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে কোনো বাধা নেই।

ঘোষণামূলক মামলা

জমিতে যার স্বত্ব আছে সে বিনা বাধায় তার জমি ভোগদখল করার অধিকারী। আবার যার আইনগত অধিকার আছে (যেমন যে লিজ নিয়েছে) সেও বিনা বাধায় ভোগদখল করার অধিকারী। সে অধিকারে কেউ বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না। বাধা সৃষ্টি করলে আদালতে মামলা করে অধিকার সম্পর্কে ঘোষণা পাওয়া যায়। এ জাতীয় মামলাকে ‘ঘোষণামূলক মামলা’ বলে।
কলিমদ্দির একখ- জমি আছে কিন্তু কিছু দিন ধরে সে শুনছে তাদের পাড়ার লুতু এ জমি জোর করে দখল নেবে। কলিমদ্দির বাবা এ জমি লুতুর শ্বশুরের কাছ থেকে ১৫ বছর আগে কিনেছিল। কলিমদ্দির বাবা প্রায় ১০ বছর আগে মারা গেছে। পাড়ার লোকের কাছে লুতু বলে বেড়াচ্ছে যে তার শ্বশুর তার স্ত্রীকে এ জমি দান করেছিল। লুতুর ছেলে কলেজে পড়ে, রাজনীতি করে, দলবল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। লুতুর শ্বশুর তার মেয়েকে সত্যি সত্যি দান করে দিলে এত দিনে প্রকাশ করত। কিন্তু লুতুর শ্বশুর মারা যাওয়ার পর এ জমি দাবি করা হচ্ছে। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কলিমদ্দি লুতুর বিরুদ্ধে ক্যানভ্যাস করেছে। তাই লুতু কলিমদ্দিকে হয়রানি করার জন্য তার জমি দখল করে শায়েস্তা করতে চায়।

কলিমদ্দি এ অবস্থায় দেওয়ানি আদালতে ‘ঘোষণামূলক মামলা’ করতে পারে। আদালত ঘোষণা দিতে পারে এ জমির স্বত্ব দখলকার কলিমদ্দি। এ জমিতে লুতু কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। যদি লুতু কলিমদ্দির জমি এরই মধ্যে দখল করে নিত তবে আর ঘোষণামূলক মামলা হতো না। তখন উচ্ছেদের মামলা করতে হতো। সে ক্ষেত্রে এ মামলা আর ঘোষণামূলক মামলা থাকত না। বিভিন্ন ঘটনার ওপর ঘোষণামূলক মামলা করা যায়।
ফাতেমা ঢাকায় গার্মেন্টে কাজ করে। সে মাঝেমধ্যে বাড়ি আসে। পাশের বাড়ির ছেলে আসাদ তাকে পছন্দ করে, বিয়েও করতে চায়। ছেলের বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো কিন্তু ফাতেমারা খুব গরিব। ছেলের বাবা প্রভাবশালী, ফাতেমাকে পছন্দ করে না। এলাকার মওলানাকে দিয়ে ফতোয়া দিয়ে দিল ফাতেমা খারাপ মেয়ে। সে ঢাকায় গিয়ে খারাপ কাজ করে। সে আর গ্রামে আসতে পারবে না। ফাতেমা গ্রামে আসতে পারবে এ মর্মে ‘ঘোষণামূলক ডিক্রি’ পেতে পারে।

সদর খান খোকসা পাইলট স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, স্কুলের অন্য সদস্যরা তাকে কমিটি থেকে বাদ দেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সদর খান ঘোষণামূলক মামলা করতে পারে। আদালত ঘোষণা দিতে পারে যে সদর খান খোকসা পাইলট স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির বৈধ সদস্য। মওলানা সোবহান ওয়াক্ফ করা জামে মসজিদের মোতাওয়ালি্ল। তাকে বাদ দিয়ে বেআইনিভাবে মওলানা আশরাফকে মোতাওয়ালি্লর কাজ করানো হচ্ছে। মওলানা সোবহান ঘোষণামূলক মামলা করে আদালত থেকে ঘোষণা পেতে পারেন যে তিনিই প্রকৃত মোতাওয়ালি্ল। এ রকম হাজারো অন্যায় কাজের প্রতিকার ঘোষণামূলক মামলা করে আদালত থেকে পাওয়া যায়।

আমরা স্বত্বের মোকদ্দমা বা টাইটেল স্যুটের কথা প্রায় সবাই জানি। স্বত্বের মোকদ্দমাও একধরনের ঘোষণামূলক মামলা। স্বত্ব নিয়ে গোলমাল থাকলে স্বত্বের মোকদ্দমা করতে হয়। আদালত বাদী বা বিবাদীর পক্ষে স্বত্বের ঘোষণা দিয়ে স্বত্বের মোকদ্দমার নিষ্পত্তি করতে পারে।

Share
Updated: March 5, 2015 — 11:25 pm

আমাদের পোষ্টগুলো ফলো এবং শেয়ার করতে ক্লিক করুন

1 Comment

Add a Comment
  1. শামীম পাটওয়ারী

    আপনার জমি কেউ দখল করে নিলে কিভাবে তা ফেরত পাবেন এই বিষয় নিয়ে দারুন একটি ভিডিও দেখুন এখানে
    https://www.youtube.com/watch?v=I-7dLj8MjIU

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

অনুসন্ধান ডটকম © 2016